আজ শুক্রবার | ১০ আশ্বিন ১৪২৭ | ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২০ | ৭ সফর ১৪৪২ | সন্ধ্যা ৭:১০
গোপালগঞ্জ, গোবড়া সবান রোড, ঢাকা, বাংলাদেশ
শুক্রবার || সন্ধ্যা ৭:১০ || ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২০

সারাবাংলায় যশোর এর খাবার এত সমাদৃত কেন ?

শেয়ার করুন

জাহিরুল মিলন , সম্পাদকীয় স্টাফ

বুধবার, ১২ আগস্ট ২০২০ | ৬:০১ অপরাহ্ণ

সারাবাংলায় যশোর এর খাবার এত সমাদৃত কেন ?
ফাইল ছবি

যশোর এর খাবার সারা বাংলায় এখন বিখ্যাত খাবারের তালিকায় স্থান করে নিয়েছে। এই খাবার সারা বাংলায় এত সমাদৃত হওয়ার অনেকগুলো কারণ রয়েছে। যশোরের ঐতিহ্যবাহী খাবারের নামসহ আলোচনা করেছেন শিক্ষক, কথাসাহিত্যিক ও সাংবাদিক জাহিরুল মিলন।

১। খই
২। জামতলার বিখ্যাত সাদেকগোল্লা
৩। চুই ঝালে খাসির মাংস
৪। হ্যালা
৫। ছাক্কা
৬। ছিটে রুটি
৭। আল্লা আল্লা
৮। খেজুরের পাটালী
৯। সরুই পিঠা
১০। ঘাটকোল ভর্তা

খইঃ

যশোর এর খাবার প্রাচীনকাল থেকে বিখ্যাত খাবারের তালিকায় খই এর নাম সবার উপরে লিপিবদ্ধ আছে।
বৃহত্তর যশোরের গ্রামাঞ্চলে একসময় ধান থেকে তৈরি এই খই এর খুবই প্রচলন ছিল।
একসময় বিয়ে, গায়ে হলুদ, বর্ষবরণ কিংবা অতিথি আপ্যায়নে এই খই ছাড়া চলতই না।

খই

তাই যশোরের বিখ্যাত নামকরা খই এখন খুব কমই দেখা যায়। তবে গ্রামে এখনও অনেক বাড়িতে এই খই এর প্রচলন আছে।
আমাদের সকলের উচিৎ এই দেশীয় ঐতিহ্যবাহী খাবারকে সংরক্ষণের মাধ্যমে দেশীয় ঐতিহ্যকে রক্ষা করা।

জামতলার বিখ্যাত সাদেকগোল্লাঃ

যশোরের জামতলার রসগোল্লা এখন সমগ্র বিশ্বে সমাদৃত। মরহুম সাদেকের তৈরি এই রসাল গোল্লা সাদেকগোল্লা নামে পরিচিত। দীর্ঘ ৬১ বছরের ইতিহাস–ঐতিহ্য ধরে রেখে নিজের শ্রেষ্ঠত্ব বজায় রেখেছে এই মিষ্টি। যশোর-সাতক্ষীরা মহাসড়ক দিয়ে যেতে নাভারণ ছাড়িয়ে জামতলা নামক বাজারে এই মিষ্টি তৈরি হয়ে আসছে যুগ যুগ ধরে। রসগোল্লার কারণেই দেশ–বিদেশে এই জামতলার নাম ছড়িয়ে পড়েছে। দেশ-বিদেশের অনেক রাষ্ট্রপ্রধান জামতলার এই বিখ্যাত মিষ্টি খেয়েছেন।

জামতলার বিখ্যাত সাদেকগ

‘সাদেকের সৃষ্টি জামতলার মিষ্টি’ এই স্লোগান নিয়েই সাদেক মিষ্টান্ন ভান্ডারের পথ চলা।
হালকা মিষ্টি, স্পঞ্জ রসগোল্লা, বাদামি রং এই মিষ্টির প্রধান বৈশিষ্ট্য।

শেখ হাসিনা, খালেদা জিয়া ও এরশাদসহ বিদেশি রাষ্ট্রীয় মেহমানরাও এই মিষ্টি খেয়েছেন।
আমেরিকা, দুবাই, মালয়েশিয়া, সৌদি আরব, ভারত, কোরিয়া, সিঙ্গাপুর ও জাপানে অনেকেই এখান থেকে মিষ্টি কিনে নিয়ে যান।
জামতলার মিষ্টি তৈরিকারক প্রতিষ্ঠানের কর্তাদের ভাষ্য চুলা ও পাত্র অন্যত্র নিয়ে গেলে এই মিষ্টির স্বাদ থাকবে না।

চুই ঝালে খাসির মাংসঃ

চুই ঝালে খাসির মাংস নামটা অন্য জেলার মানুষের কাছে অপরিচিত লাগলেও যশোর জেলায় সুপরিচিত সকলের কাছে।
খাসির মাংস ও লতাজাতীয় এই চুই ঝালের মিশ্রণে তৈরিকৃত খাসির মাংস যে না খেয়েছে সে বুঝতেই পারবেনা এর কি স্বাদ।
যশোর, খুলনা ও সাতক্ষীরায় এই চুই ঝালের খাসি রান্নার বেশ প্রচলন রয়েছে।
সাতক্ষীরার চুকনগরের আব্বাস হোটেল এই চুই ঝালে খাসির মাংস রান্নায় বিখ্যাত।

 

চুই ঝালে খাসির মাংস

মূলত মাংসের গুণগত মান ও স্বাদের ভিন্নতার জন্য খাসির মাংসে এই চুই ঝাল ব্যবহার করা হয়।
অবশ্য এখন গরুর মাংসেও চুই ঝাল ব্যবহার করা হচ্ছে। চুই ঝালের গাছ কিছুটা পানের গাছের মত।

এর কান্ড মসলা হিসেবে মাংসে দিলে ঝাল ঝালের একটা অন্যরকম স্বাদ পাওয়া যায়।
তবে সাধারণ ঝালের ঝাঁঝ অনেকক্ষণ থাকলেও এই চুই ঝালের ঝাঁঝ ক্ষণস্থায়ী তাই এর স্বাদও অপূর্ব।

হ্যালাঃ

হ্যালা মূলত মিষ্টি দিয়ে তৈরি একধরনের মিষ্টি জাতীয় খাবার।
এটি আতপ চালের গুঁড়া, খেজুর গুড়, তেজপাতা ও নারিকেলের সমন্বয়ে তৈরি একধরনের সুস্বাদু খাবার।
হ্যালা শুধু এবং চালের রুটি দিয়ে খাওয়া হয়।

তবে রুটি দিয়েই বেশীরভাগ ক্ষেত্রে খাওয়া হয়। এজন্য একে অনেক স্থানে হ্যালা রুটিও বলা হয়। গ্রামাঞ্চলে শবে বরাত, বাড়িতে মিলাদ মাহফিল এবং বিশেষ বিশেষ অনুষ্ঠানে এই হ্যালা খাওয়ার প্রচলন ছিল এবং এখনও অনেক যায়গায় আছে।

 

hela (হ্যালা)

ছাক্কাঃ

ছাক্কা যশোর এর খাবার এর একটি বিখ্যাত ও নামকরা খাবার।

Chakka (ছাক্কা)

 

বিয়ে-শাদি, সুন্নাতে খাতনা, অতিথি আপ্যায়ন, কুলখানিসহ বর্তমানে যেকোন অনুষ্ঠানে ছাক্কা ছাড়া অনুষ্ঠান জমেই না।
মুগ কিংবা ছোলার ডাল, খাসির চর্বির সংমিশ্রণে তৈরি এই ছাক্কা ছাড়া অনুষ্ঠান যেন অপূর্ণ থেকে যায়।
খাবারের শুরুতে ছাক্কা পরিবেশন করা হয়; পরে মাছ, মাংস বা অন্য কিছু। অনেকে ছাক্কাকে সুস্বাদু করার জন্য কলিজাও দিয়ে থাকে।

ছিটে রুটিঃ

যশোরের অন্যতম ঐতিহ্যবাহী খাবারের মধ্যে ছিটে রুটি একটি।
নতুন কুটুম বা বিয়ের পর জামাই শ্বশুরবাড়িতে আসলে এই রুটি দিয়ে মুরগির মাংস পরিবেশন করা হয়।
আতপ চাল থেকে তৈরি গুড়া দিয়ে এই বিশেষ ধরনের ঐতিহ্যবাহী রুটি তৈরি করা হয়।

chite ruti

 

তাই বিয়ে বাড়িতে জামাই আদরে এই অতুলনীয় ছিটে রুটি আর মুরগি মাংসের জবাব নেই।
ছিটে রুটি নরম এবং কাগজের মতো পাতলা হয়। অন্য রুটির তুলনায় খুব অল্প সময় নিয়ে তৈরি হয় এই ছিটে রুটি।

এই রুটি মুরগির মাংস দিয়ে খেতে সব থেকে ভাল লাগে। তবে অন্য যেকোন মাংস দিয়েও খেতে ভাল লাগে। যশোরের প্রায় সব উপজেলাতেই এই ছিটে রুটি বেশ বিখ্যাত।

আল্লা আল্লাঃ

আল্লা আল্লা নামে কোন খাবার আছে এটা শুনে অনেকে হয়ত অবাক হতে পারে।
কিন্তু যশোরে একসময় এই আল্লা আল্লার ব্যপক প্রচলন ছিল এবং এখনও আছে।
নবান্নে নতুন ধান বাড়িতে আসার পর সেই ধানের আতপ চাল দিয়ে এক ধরনের সাদা ক্ষীর রান্না করা হয় যার নাম ‘আল্লা আল্লা’।

Allah Allah( আল্লা আল্লা)

 

এই ক্ষীরের বিশেষত্ব হল এটা আতপ চাল, নারিকেল আর লবণ দিয়ে রান্না করে তা কলাপাতায় নিয়ে খেতে হয়।
সাধারণত এই ক্ষীরে কোনো মিষ্টি দেওয়া হয় না। তবে সবকিছুর পরিবর্তনের সাথে অনেকে এই ক্ষীর চিনি কিংবা গুড় দিয়েও রান্না করেন।

এই ক্ষীর বাচ্চারা একসঙ্গে ‘আল্লা আল্লা’ বলে চিৎকার করে আনন্দের সাথে খায়।
তবে মুরব্বিরা গল্প করে যে এই আল্লা আল্লা অনেকের মনের আশা পূরণ করার জন্যও দেওয়া হয়ে থাকে।
আবার গ্রীষ্মের সময় বৃষ্টির জন্যও আল্লা আল্লা দেওয়া হয়।

প্রচন্ড গরমের সময় যখন বৃষ্টির দেখা মেলা ভার সেই সময় ছোট ছোট গর্ত করে তার মধ্যে পানি দিয়ে ব্যাঙ ছেড়ে ছোট বাচ্চারা ‘আল্লা মেঘ দে পানি দে’ গান গায় আর আল্লা আল্লা ক্ষীর খায়।
বহুবছরের প্রাচীন এই আল্লা আল্লা আজও যশোর অঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী খাবারের তালিকায় রয়েছে।

খেজুরের পাটালীঃ

খেজুরের পাটালী যশোর এর খাবার তা প্রায় সবার জানা। কথায় আছে যশোরের যশ খেজুরের রস।
এই খেজুরের রস জালিয়ে পাটালী তৈরি করা হয়। বর্তমানে যশোরের এই ঐতিহ্যবাহী পাটালী বিদেশেও রপ্তানি হচ্ছে।
খেজুরের রস দিয়ে বিভিন্ন রকম পায়েস ও মিঠাও তৈরি হয়। রসের ক্ষীর তার মধ্যে অন্যতম।

patali-গুঁড়ের-পাটালী

 

শীত মৌসুমে রসের ক্ষীর না হলে যশোর অঞ্চলের লোকেদের যেন মনই ভরে না।
এই রসের ক্ষীর মাতিয়ে রাখে সমগ্র যশোরকে। গাছ থেকে রস পেড়ে এনে সেই রস জালিয়ে গুঁড় আর পাটালী তৈরি করা যায়।

তবে পাটালী তৈরি করতে হলে রসকে গুঁড়ের চেয়ে একটু বেশি জাল দিতে হয়।
যখন রস একেবারে লালচে থেকে একটু কালচে আকার ধারণ করার আগ মূহুর্ত আসে ঠিক তখনি তা নামিয়ে কলার খোলাই বা কাপড় বিছিয়ে অথবা বাঁশের তৈরি যেকোন উপকরণে ঢেলে বেশ কয়েক ঘন্টা রেখে দিলেই তৈরি হয়ে যায় চমৎকার সুস্বাদু খেজুরের পাটালী।

সরুই পিঠা-

যশোর এর খাবার এর মাঝে সরুই পিঠা খুবই জনপ্রিয় একটি পিঠা। সুগন্ধি আতপ চালের গুঁড়া, খেজুর গুড় আর কাঁচা নারিকেল হল এই পিঠা তৈরির মূল উপকরণ।
চালের গুঁড়া সিদ্ধ করে সেই গুঁড়ার খামির তৈরি করে পিঁড়ির ওপর কিছুটা খামির লম্বা লম্বা করে বল বানিয়ে তারপর সেই বল হাতে কেটে দুই মাথা চিকন করে এই পিঠা বানাতে হয়।

সরুই পিঠা

 

হাত দিয়ে বানাতে হয় বলে একে হাতে কাটা পিঠাও বলা হয়। তবে এখন এই পিঠা মেশিন বা কলে কেটেও বানাতে দেখা যায়। সাধারণত শবে মেরাজের রোজা রেখে সরুই পিঠা আর খই একসঙ্গে মিশিয়ে ইফতার করা হয়।
তবে অতিথি আপ্যায়নেও এই পিঠার ব্যবহার দেখা যায়। কালের পরিবর্তনে দিন দিন এই পিঠা হারিয়ে যাচ্ছে।

ঘাটকোল ভর্তা-

ঘাটকোল পছন্দ করেনা এমন মানুষ পাওয়া দুষ্কর। যশোরের প্রায় সবার প্রিয় খাবার ঘাটকোল।
অনেকে ঘেঁটকচু বলেও চেনে।
ঘাটকোল বিভিন্ন উপায়ে খাওয়া যায়। ঘাটকোল ভর্তা, ঘাটকোল ভাজি, ঘাটকোল ভুনা আরও কত পদ।

ঘাটকোল ভর্তা-

 

এছাড়া কাঁঠাল বিচি দিয়েও ঘাটকোল রান্না করা যায়। গ্রীষ্ম-বর্ষা সব ঋতুতে এখন ঘাটকোলের কদর দেখা যায়।
যশোরের বিভিন্ন যায়গায় প্রচুর ঘাটকোল গাছ জন্মে। মূলত ঘাটকোলের ডাঁটা খাওয়া হয়ে থাকে।
তবে পাতা খাওয়ারও প্রচলন আছে। এই ঘাটকোলের বিভিন্ন ঔষধি গুনও আছে।

Gopalganj, Gobra Saban Road, Dhaka Bangladesh
Acting Editor: Masum Akter Tanim, Newsroom And Management Mobile: +8801763-234376 || Communication With The Editorial Council: 01780-242169
Email: press24.info2020@gmail.com, press24.bangladesh2020@gmail.com, Copyright © 2019-2020, development by webnewsdesign.com